Time Machine - the 4th Dimension
BD Trade Blogs
> Blogs > কবিতা > প্রায়শ্চিত্ত

প্রায়শ্চিত্ত


অসীম তরফদার

ফাগুনের মাঝ রাত;
বাইরে বসন্তের আকাশ তারা ঝলমল
বাতাসে মৌরী ফুলের ঘ্রাণ;
তবু মন ভালো নেই, চোখে নেই ঘুম।
অথচ পাশের মানুষটি নিবিড় ঘুমে মগ্ন-
পৃথিবীর সব কোলাহল ভুলে আচ্ছন্ন তন্দ্রায়।
তার ভালোবাসার ছোঁয়াতেই আমার সিক্ত হবার কথা ছিল
আপ্লুত হবার স্বপ্ন ছিল দুবাহুর বেষ্টনে;
অথচ তার দ্ব্যর্থহীন নি¯প্রভতায় সেই স্বপ্ন আমার
ভাঙা আয়নার কাঁচ - খান খান!
মনে হয় তাহার ভেতর কোন ভালোবাসাই নেই!
অনুরণন নেই প্রেমেরে প্রত্যাশার।
তবু জীবনের তাগিদেই এক ঘরে এক শয্যায় এই সহবাস
হয়ত নিয়মের কারণেই এই সংসার।
ব্যালকুনীর গ্রীল ধরে দাঁড়াই, নিজেকে নিয়ে ভাবি
আমাকে সঙ্গ দেয় নিশীথের নীলিমা;
দখিনা বাতাস, তার স্নিগ্ধ পরশ
আমায় ভুলিয়ে দেয় ভাঙা স্বপ্নের স্বাদ।
তবু বুকের ভেতর চেপে থাকা দীর্ঘশ্বাস
সকল নিষেধ অমান্য কওে; বেড়িয়ে আসে-
“আমি কি কারো ভালোবাসার যোগ্য নই
কেউ কি আমায় সত্যি করে বাসেনি ভালো”?
মৃতপ্রায় জোছনার মত অস্পষ্ট ভাবে
অতীতের বর্ণিল দিন চোখে ভাসে-
জীবনে প্রথম এ মনে দাগ কেটেছিল শোভন,
মাছরাঙা পাখির মতন আমার কিশোরী হৃদয়
বুকের দীঘিতে তার নিবিষ্ট হয়ে খুঁজেছিল লাল পদ্ম !
অক্লান্ত ডুবুরী সাঁতার কেটে অবশেষে দেখলাম-
আমার জন্যে সেই বুকে কোন অনুভুতি নেই !
অব্যক্ত অভিমানে সেদিন প্রতিজ্ঞা করেছিলাম,
ভালোবাসার স্বপ্ন আর দেখব না কোন দিন।
তারপর কৈশোর লুপ্ত হল সময়ের ফাঁদে
কালের আবর্তনে অনাবৃত হল যৌবন,
এক সন্ধ্যায় পরিচয় হল এক তরুণ কবির,
ভাসা ভাসা ডাগর দুটি চোখ তার
হরিণের চোখের মতন সুন্দর আর মায়াময়।
আমি তার কবিতায় মুগ্ধ হলাম, বললাম-
“কবি, তুমি আমাকে নিয়ে লিখবে কবিতা,
অসম্ভব সুন্দর একটা কবিতা, শুধু আমাকে নিয়ে”?
কবি তার নেশা ভরা চোখ তুলে তাকাল; বলল-
“কাউকে নিয়ে লিখতে বড় ভয় হয়
যদি অমর্যদা করে ফেলি কিংবা যদি
ব্যর্থ হই তুলে ধরতে সঠিক!”

আমি হেসে উঠি কবির কথায়-
আমি কি এমন কেউ


যার মর্যাদা নিয়ে এত ভয় সংশয় তোমার ?
আমাকে নিয়ে তুমি যা-ই লিখ
তাতেই আমি খুশি, সম্মানিত হব।
“এ ছাড়া তো আরও ভয় আছে, জড়াবার ভয় !”
“তোমায় দিয়ে কিচ্ছু হবে না কবি।
এতো ভয় পেলে চলে? একবার লিখেই দেখো না;
জড়ালেও মোটেই হারাবার ভয় কিন্তু নেই।
“হারাবার ভয় আছে কিনা জানি না, তবে এটা ঠিক
কোন কোন ফুল আছে তুলতে গেলেই রক্ত ঝরে
তবুও সেই ফুল তুলতে বড় সাধ হয় মনে
কিছু কিছু পথ আছে চলতে গেলেই দূরে সরে
তবুও চলতে মানুষের মন সেই পথে আগ্রহ ভরে,
নিশ্চিত পুড়ে মরবার ভয় সত্ত্বেও প্রজাপতি মন
মাঝে মাঝে ঝাপ দেয় জলন্ত আগুনে
আর তাতে খুঁজে পায় সুখ-শান্তি অনাবিল।
না হয় আমিও তেমন করে সেই পথে হাঁটলাম
পথ হারাবার কিংবা পুড়ে মরবার ভয় সত্ত্বেও !”
সত্যি একদিন সে আমায় নিয়ে কবিতা লিখে আনল,
আমি মুগ্ধ হলাম, তাকে দিলাম লাল গোলাপ;
জানি না সে আমার চোখে কী খুঁজে পেল
তার ঠোঁটে খেলা করে গেল তৃপ্তির হাসি,
আমাকে বুকে জড়িযে আদর এঁকে দিল ললাটে।
গোধুলির আবীর ছড়ানো আকাশের নীচে
দুটি হৃদয় আবিষ্ট হল ভালোবাসায়।
আমি প্রেমে পড়ালাম- কবি ও কবিতার।
কবি কল্পলোকে স্বপ্ন সাজায়
হৃদয়ের পটে আর নন্দিত কবিতায়;
বাস্তবতার নির্ভেজাল কথার মালায়
অথবা বিলাসী কল্পনার মিশেলে সাজানো শব্দের সম্ভারে
উদ্বেলিত আমি ছন্দদোলায় পালেল নৌকার মত ভেসে যাই,
আর মনের আকাশে ডানা মেলে সহস্র স্বপ্ন বলাকা।
ঈশান থেকে ধেয়ে আসে কাল বৈশাখী,
হঠাৎ দাপটে তার আমাদের স্বপ্নেরা লুটায় মাটিতে,
বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত হয়ে;
অবশেষে আমাদের যোগাযোগ ছিন্ন হয়।
কবি অনেক চেষ্টায় ছিল বন্ধন টেকাবার
আহত স্বপ্নকে নতুন করে জাগিয়ে তোলবার।
শেষবার একটা চিঠিতে লিখেছিল
“নিশ্চিন্তে উড়ে চলা দুটি পাখি প্রলয়ের মাঝে ছিন্ন হয়ে গেল
প্রচন্ড আকস্মিকতায়, কোন কিছূ বুঝে উঠবার আগেই,
এমনকি দুটো কথা বলারও অবসর হল না।
নিপা, আমার ভালোবাসার প্রতি আমি প্রচন্ড বিশ্বাসী
ঠিক যতটা আস্থা আমার আপনার অস্তিত্বে।
কিন্তু শংকিত মন, আহত হৃদয় আজ শুধু একবার
তোমার আশ্বাস পেতে চায়, সান্তনা খোঁজে।
শুধু একবার আজ আবার নতুন করে বলো-
ভালোবাসার বন্ধুর পথ অতিক্রমনের অভিযানে
জীবনের প্রতিকুল ক্ষণে তুমি পাশে থাকবে।
তুমি পাশে থাকলে আমি বড় সাহসী হয়ে উঠি,
বাঘের থাবা থেকে ছিনিয়ে আনতে পারি আর্ত জীবন;
এমন কি পারি মৃত্যুর বুকে চুম্বন দিতে।


তোমাকে পাবার অদম্য বাসনা এই মনে
তোমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন অনেক আশা এ বুকে
শুধু তোমার সমর্থন পেলেই স্বপ্নেরা বেঁচে রবে
আর জয়ী হবে আমাদের অবিনশ্বর প্রেম।”
সত্যি যদি হৃদয় দিয়ে চাইতাম
তবে দুর্গম পথ অতিক্রম করা যেত সহজেই;
কিন্তু কবির সাথে যোগাযোগ হীনতার শুরুতেই
সেই দুর্বল ক্ষণে হঠাৎ একদিন শোভন এসে
কৃষ্ণচূড়ার বীজ ছড়ালো আমার হৃদয়ে, বলল-
“মন দিয়ে একটু যত্ন করো দেখবে
একদিন লাল ফুলে ভরে যাবে আমাদের ফঙ্গন।”
আমার প্রথম ভালো লাগা, আমার হৃদয়ে শিহরণ জাগানো
সেই প্রথম পুরুষের এই অনাকাক্সিক্ষত কাছে আসা
আমার মন থেকে মুছে দিল কবিতার মোহ;
আর আমি নিষ্ঠুর অবহেলায় কবির স্বপ্নকে দুপায়ে মাড়িয়ে
দেখলাম কৃষ্ণচূড়ার শাখায় রক্ত বর্ণ ফুলের স্বপ্ন।
কয়েক বছর পরে একদিন হঠাৎ মনে হল
কোথায় যেন একটা পিছুটান রয়ে গেল;
আর কিছু না হোক একবার অন্তত মুক্তি নেয়া প্রয়োজন।
ছুটে যাই কবির কাছে, প্রার্থনা করি মুক্তি ও আশীর্বাদ;
কবির সকরুন দৃষ্টিতে যেন সূর্যাস্ত শেষের বিষন্ন আঁধার
বুকের ভেতর নদীর পাড় ভাঙার শব্দ।
গোধূলীর হলুদ-বাদামী আকাশ, বয়ে চলা নদী আর
কবির বিষন্ন চেহারা পেছনে ফেলে, তার বুকে জেগে ওঠা
নব সম্ভাবনার পথে পদাঘাতের ছাপ ফেলে ফেলে
আমি চলে এলাম আমার স্বপ্ন পুরুষের কাছে।
কিন্তু তাকেও পাওয়া হল না আমার;
সে কথা দিয়েছিল পঙ্খীরাজে চেপে এসে
নিয়ে যাবে ফুলে ফুলে সাজানো মিলন মন্দিরে;
কিন্তু কথা সে রাখেনি।
অবশেষে যাকে পেলাম এই জীবন খেয়ার সহযাত্রী রূপে
তার ভালোবাসা পেলে হয়ত তবুও স্বস্তি পেতাম
কিন্তু তাও জুটেনি এই পোড়া কপালে !
তাই কোন কোন মাঝ রাতে এভাবেই জেগে জেগে
কথা বলি তারাদের সাথে; কোন কোন মাঝ রাতে
এভাবেই তাড়া করে কবির সেই বিষন্ন মুখ
আর তার চোখের দৃষ্টিতে সেই স্বপ ডুবীর ছবি,
কোন কোন মাঝ রাতে আমার বুকের মধ্যে এভাবেই
অনুভব করি নদীর পাড় ভাঙার সেই শব্দ !
কোন কোন মাঝ রাতে আলোহীন অন্ধকারে এভাবেই
ছেয়ে যায় আমার ভুবন, বিষাদে ভরে যায় মন;
কবির প্রেম তখন জোনাকীর আলোর মত জ্বলে ওঠে
আমার জীবনের এক মাত্র সত্যি হয়ে
আমার বেঁচে থাকার প্রেরণা হয়ে।


সাহিত্য >> কবিতা